দেবদাস মজুমদার >>

সাংবাদিক, রাজনীতিক, দৈনিক ইত্তেফাক-এর  প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া । মানিক মিয়া নামেই তিনি সমধিক িপরিচিত। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে তাঁর বড় ভূমিকা। নিজের লেখনী এবং ইত্তেফাক দুটিই এ দেশে সে সময়ে মানুষের মুখপত্রের বিশেষ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে এ দেশে সাংবাদিকতা তাঁর হাতেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ।

তফাজ্জাল হোসেন মানিক মিয়া কালজয়ী আপোষহীন কলমযোদ্ধা । তিনি ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন  । বাবা মুসলেম উদ্দিন মিয়া। শৈশবেই মাতৃহারা হন মানিক মিয়া। গ্রামের পূর্ব ভান্ডারিয়া মডেল প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষা জীবন শুরু। কিছুদিন পর ভান্ডারিযা হাইস্কুলে ভর্তি হন। স্কুল জীবনেই তার মেধার পরিচয় পাওয়া যায় । এক সময় সহচর সহপাঠীদের কাছে ক্ষুদে নেতা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। এই স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত এবং পরে পিরোজপুর জেলা হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং এই স্কুল থেকে সাফল্যর সহিত মেট্রিক পাশ ও ১৯৩৫ সালে বরিশাল বি এম কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বি এ ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন সে সময় বারিশাল জেলা তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাখে দেখা হয়।

১৯৬৩ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের আভিজাত পরিবারের মরহুম খন্দকার আবুল হাসান সাহেবের কণ্যা মাজেদা বেগমের সাথে বিবিাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।সংসার জীবনে দুই ছেলে দুই মেয়ের জনক ছিলেন। চাকরি কালিন এক মুন্সেফ তার সাথে একদিন খারাপ ব্যাবহার করলে তার প্রতিবাদ করেন এবং চাকরি থেকে ইস্তফা দেন । চাকুর ছেড়ে দিয়ে তিনি যোগদেন বরিশাল জেলার বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগের অফিসার পদে। এখানে অল্প কিছুদিন চাকুর করার পর তা ও ছেড়ে দিয়ে কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিস লীগের অফিস সেক্রেটারি পদে যোগ দেন। সে সময় রাজনৈতিক প্রচারনা জনগনের মাঝে পৌছে দেবার লক্ষ্যে আবুল মনসুর আহমেদ এর সম্পাদনায় “ ১৯৬৪ সালে প্রখম ‘দৈনিক ইত্তেহাদ ’ প্রকাশিত হয়। পরের বছর উক্ত পত্রিকায় পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হিসাবে যোগ দেন এবং পত্রিকার মাধ্যমে গণমাধ্যম জগতের সাথে বেশ ঘনিষ্টতা গড়ে উঠে। মাত্র দেড় বছর এই পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। দেশ বিভাগের পর পত্রিকাটি নিজ দেশে আনার অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু তিনবারই পূর্ব পাকিস্তানে আনতে বাধা দেওয়া হয় এবং পুর্ব পাকিস্তানে পত্রিকাটি নিষিদ্ধ ঘোষনা দেওয়া হয়। বার বার পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বাধা প্রাপ্ত হওয়ায় মনিক মিয়া পত্রিকাটি বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেন।এবং ঢাকায় চলে আসেন ।

১৯৪৮ সালে পুর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালী মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেন এতে বাঙালির পাকিস্তানি মোহ থেকে বেরিয়ে আসে। ১৯৪৯ সালে মুসলীমলীগের বিরোধী শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে পুর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। সে বছরই  রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হিসাবে আবির্ভাব ঘটে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ,যার সম্পাদকের দায়িত্ব পান আবদুল হামিদ খান ভাসানী । ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট মানিক মিয়া এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্ব ভার গ্রহন করেন। ১৯৫৩ সালে তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে রূপান্তরিত হয় এবং আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। ১৯৫৯ সালে সামরিক আইন লঙ্গনের অভিযোগে জেল জীবন কাটে পুরো একবছর। ১৯৬৩ সালে আবারো মানিক মিয়াকে জেলে পাঠিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক নিষিদ্ধ ও নিজস্ব প্রেশ নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস কে বাজেয়াপ্ত করা হলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য ঢাকা টাইমস ও নিউ নেশন বন্ধ হয়ে যায়। বৃহৎ ভুমিকায় ব্রত এই পত্রিকাটির ওপর সকল প্রকার বিধি নিষেধ গণআন্দোলনের মুখে প্রত্যাহার করে নেন সরকার। ১৯৬৯ সালে ১১ ফেব্রুয়ারী  পত্রিকাটির প্রকাশনা আবার শুরু হয়। তিনি তাহার জীবন সাধনার মধ্যে দিয়ে যে আলোর পথটি রচনা করেছেন তা অর্নিবান। বাস্তবিকই বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি আমাদের সংগ্রাম সাধনার এবং অর্জনের গৌরবোজ্জল ইতিহাসে মানিক মিয়ার ভুমিকা চিরস্বরণীয়। বহু বাধাঁ বিপত্তি উপেক্ষা করে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার নির্যাতনের বিরূদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইত্তেফাকে রাজনৈতিক হালচাল ও পরে মোসাফির ছদ্ম নামে উপসম্পাকীয় লিখতে থাকেন। সেখানে ক্ষুরধরা লেখনির মাধ্যেমে মানিক মিয়া তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনমানসে যে স্পন্দন জাগিয়েছিলেন , তাহা আনিয়া দিয়াছে নব জাগৃতিক বার্তাবরণ। ১৯৬৩ সালে আন্তর্জাতিক প্রেস ইন্সটিটিউট পাকিস্তান শাখার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে কাশ্মিরের দাঙ্গা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থাপিত দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির প্রথম সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

মানিক মিয়া শুধু যে সৎ বস্তুনিষ্ট নির্ভিক সাংবাদিকতার পথিকৃত ছিলেন তাই নয় , তিনি ছিলেন কোমল হৃদয় ও দৃরচেতা এক প্রবাদ পুরূষ, একাধারে সাংবাদিক কলামিস্ট, সম্পাদক এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম দিকনির্দেশক।স্বদেশ প্রেম মানব প্রীতি আর সামাজিক দায়িত্ব চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কলমকে ব্যাবহার করেছেন সংগ্রামের হাতিয়ার হিসাবে।

নির্ভীক আপোষহীন এই কলম যোদ্ধা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সমাজনীতি, শিক্ষা সংস্কৃতি, ধর্মীয় কুসংস্কার সহ সকল বিষয়ে তিনি কলম চালিয়েছেন।

২৬ শে মে ১৯৬৯ সালে অসুস্থতা কাঁধে নিয়ে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে রাওয়ালপিন্ডে যান, এবং ১ জুন রাতে তিনি আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন ।

তথ্যসূত্র > মুক্ত বিশ্বকোষ

ছবিসূত্র > ইত্তেফাক

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন