গত ৫ জুন ২০১৬ ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস এবং ২২ মার্চ ছিল বিশ্ব পানি দিবস। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল “Go Wild for Life” যার বাংলা ভাবানুবাদ “বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাচাঁয় দেশ এবং পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পানি ও বর্জ্য পানি’। প্রতিপাদ্য সে যাই হোক, এটা যে কেবল দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা আমরা সবাই জানি। বাস্তবে এর রূপদান আলেয়ার আলোর মত। বিশ্ব জুড়ে প্রতি বছর পরিবেশ দূষণজনিত কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৭ লাখ শিশুর মৃত্যু হয় বলে নতুন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। অর্থাৎ, প্রতি চার শিশুর মধ্যে মারা যায় একজন। ডব্লিউএইচও-র প্রতিবেদনে বলা হয়; অনিরাপদ পানি, পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং ঘরে ও বাইরে বায়ুদূষণের কারণে এ মৃত্যু ঘটে। তবে কিছুটা দেরিতে হলেও মানুষ বুঝতে শুরু করছে পরিবেশের বিপক্ষে গিয়ে লাভের চেয়ে বরং ক্ষতিই বেশী। যার জন্য ইদানিং দেখা যায় সরকার পরিবেশ রক্ষার্থে সচেতন হয়ে উঠছে।

যদিও কবি আগেই  বলেছিলেন তাঁর কবিতায়- ”এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”। কবির কথা না হয় বাদ দিলাম নিজের কথায় আসি; পরিবেশ শব্দটির ইংরেজী অনুবাদটা জানার সাথে আমার একটি ঘটনা জড়িত আছে, আমার এক স্কুল সহপাঠীর কাছে একদিন Environment শব্দের অর্থ জানতে চাইলাম, বন্ধুটি আমাকে তিনদিন অপেক্ষা করিয়ে এর অর্থ বলল। কেন সে আমাকে তিনদিন অপেক্ষা করিয়েছিল তা সেদিন বুঝতে না পারলেও আজকে বুঝতে পারলাম, হয়ত বিষয়টি জনগুরত্বপূর্ণ বিধায় আমাকে এর গুরুত্ব বুঝানোর জন্য সময়ক্ষেপণ করেছে। পরিবেশ একটি জনগুরত্বপূর্ণ ব্যাপার বিষয়টি আমি তখন বুঝতে পারিনি। তবে এর গুরুত্ব কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছি ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যখন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ঢাকা শহরের জন্য ড্যাপ ঘোষণা করল। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অপরিকল্পিত নগরী জনগনের কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশী বয়ে আনবে। ড্যাপের (ডিটেইল এরিয়া প্ল্যাণ) মূল বিষয়ই হলো, কোন উন্নয়ন কাজের জন্য চিহ্নিত নদী, খাল বা জলাশয় ভরাট করা যাবে না। যেখানে যা আছে সেখানে তা রেখে দিতে হবে। সেদিন অনেকেই এটির বিরোধীতা করেছেন কারণ ঢাকা শহরের এক টুকরো জমির দাম সোনার চেয়েও বেশী। বিশেষ করে যারা খাল, নদী, জলাশয় ভরাট করে নিজেদের দখল নিচ্ছে তাদেরতো প্রধানমন্ত্রী চক্ষুশূল হলেন। তাঁর সেই দিনের সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিলনা তা আজ প্রমাণিত হলো যখন গত ৩ জানুয়ারী রাজধানীর গুলশান মার্কেটে আগুন লাগল। দেখা গেল যে পর্যাপ্ত জলাশয় না থাকার কারণে পানির সংকটে আগুন নেভানো যাচ্ছে না। সেই আগুনে পুড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হলো। ঘটনার পরিপেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন বাড়ি বা মার্কেট নির্মাণ করতে হলে পাশে খালি জায়গা রাখতে হবে বা জলাশয় রাখতে হবে। এ তো গেল আমাদের রাজধানীর চিত্র। কিন্তু যদি আমাদের মঠবাড়িয়ার কথা চিন্তা করি, আজ থেকে দশ বছর আগে, মঠবাড়িয়ায় পানির সমস্যা কি তা মানুষ জানতো না। হ্যাঁ, তবে তখনোও খাবার পানির সংকট ছিল, কিন্তু  প্রতিদিনের পানির চাহিদা মিটানোর জন্য আমাদের কোন বেগ পেতে হয়নি। নিউ মার্কেটের পুকুর, কলেজের পুকুর, কেন্দ্রিয় মসজিদের পুকুরে মঠবাড়িয়া খাল থেকে জোয়ারে পানি এসে ভরে থাকতো সবসময়। তখনকার সময়ে কিশোররা গোসলের জন্য বাসার পুকুরে ভিড় না করে চলে আসতাম নিউ মার্কেট কিংবা কলেজের পুকুরে। এখনকার সময়ের কিশোররা গোসলের জন্য নিউ মার্কেট কিংবা কলেজের পুকুরে যায়না। কারণ কলেজের পুকুরে আর পানি থাকে না। গ্রীষ্মকালে দেখে মনে হয় যেন চাঁদের কোন গিরিখাদ। শুধু পুকুরের আকার আছে, কিন্তু পানি? সে অদৃশ্য। তবে অনেক পাইপের দেখা মিলে। শুনেছি কিছু উদীয়মান সাবেক ছাত্রনেতারা নাকি প্রতিটি পাইপ থেকে টাকা দাবি করে, না হলে তারা কলেজ পুকুর থেকে পাইপ দিয়ে পানি নিতে দেয় না। এটা তারা প্রশংশার দাবি করে কারণ তারা হয়ত বুঝতে পেরেছেন কলেজের পুকুরের পানি এভাবে বন্টিত হলে, পুকুর একদিন শুকনো ভূমিতে পরিনত হবে।

আসলে মঠবাড়িয়ায় পানি সমস্যা নিত্য দিনের ঘটনা এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। কিন্তু কেন এমনটি হলো? মঠবাড়িয়া থেকে মাত্র ৮ কিমি. দুরে প্রবাহমান বলেশ্বর নদী, পৌর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বৃহৎ একটি খাল। মুলত এই খালকে ঘিরেই পরিচালিত ছিল মঠবাড়িয়ার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। এটি ছিল পরিবহনেরও অন্যতম একটি মাধ্যম। কিন্তু এ খাল দিয়ে এখন পরিবহন হয়না। এ খাল এখন ব্যবহৃত হচ্ছে ময়লা ফেলানোর বাগার হিসেবে। এ প্রসংগে রবীন্দ্রনাথের ’দুই বিগা জমি” কবিতা মনে পড়ে গেল; সমাজপতি তাঁর বাগানবাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য বৃদ্ধের শেষ সম্বল দুই বিগা জমি দখল করে নেয়। আসলে সমাজপতিরা বড়ই সৌন্দর্য প্রিয়। হতদরিদ্রের দুই বিগে দিয়ে আর কি হবে? বাগান বাড়ি হলে বাবু তাঁর শেষ নিঃশ্বাস আরামে ত্যাগ করতে পারবেন। আর বাবু যেহেতু নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন সে তো আর না জেনে ভূমি দখল করছে না। বাবু সমাজের মাথা, কত জ্ঞান তাঁর। সে নিশ্চয়ই জেনেছে কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ।

এ তো গেল রবীন্দ্রনাথ যুগের কথা, অনেক আগের ঘটনা এগুলো, বর্তমানে আমরা কি করছি? সবাই ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করার জন্য পুকুর, খাল, বিল সব ভরাট করে ফেলছি। এতে যে আমাদের দীর্ঘ মেয়াদী ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হবে তা চিন্তা করছি না। পৌর শহরে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং অনেকাংশে এটি ঢাকা শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার চেয়েও ভাল হয়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরের মত আমরাও বর্জ্য ফেলছি আমাদের পানি প্রবাহের একমাত্র মাধ্যম খালটিতে। এতে করে বুড়িগঙ্গার মত আমাদের খালের পানিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ড্রেন বা পয়ঃনিষ্কাশণ ব্যবস্থা যদি খালের পানির সাথে  মিশে তাহলে খালের পানি তো দূষণ হবেই। আমরা সকলে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য সবাই যার যার জলাশয়, খাল, পুকুর ভরাট করছি। সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা নির্মাণ করছি, কিন্তু চিন্তা করছি না আমাদের পরিবেশ কি ঠিক রাখছি? লন্ডন তাদের টেমস নদীকে ঘিরেই আধুনিক সভ্যতা গড়ল কিন্তু ঢাকাবাসী পারল না তাদের বুড়িগঙ্গাকে ঘিরে আধুনিক শহর ঢাকা গড়তে। তেমনি মঠবাড়িয়ার মানুষের বা কি দোষ, আমরাও পারলাম না আমাদের খালকে ঘিরে আধুনিক মঠবাড়িয়া গড়তে। উন্নয়ন ঠিকই হচ্ছে তবে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না কারণ সমস্যাটি অপরিকল্পিত উন্নয়ন। অপরিকল্পিত উন্নয়নের দেখা মিলে মঠবাড়িয়ায় সদ্য নির্মিত কয়েকটি কালভার্টের দিকে তাকালে; মঠবাড়িয়ার খালটিতে কালভার্ট করার কারণে এখন আর নৌকা যোগে মালামাল বহন করা যায়না এবং স্বাভাবিক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, যার ফলে পলি পড়ে খালটি ভরে যাচ্ছে। খালটি ভরাট হওয়ার কারণে দেখা দিচ্ছে পানি সংকট। সড়ক পথের উন্নয়ন অবশ্যই দরকার কিন্তু অন্য একটি পথ নষ্ট করে নয়। কালভার্ট আমাদের দরকার ছিল সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি করার জন্য কিন্তু গৃহীত কৌশলটি ঠিক ছিল কিনা সেটি ভাবার বিষয়। এটা আসলে আমাদের পরিকল্পনার অভাব। জানিনা আমাদের পৌরসভায় কোন নগর পরিকল্পনাবিদ আছে কিনা? অগ্রানোগ্রামে যদি থাকেও বর্তমানে যে এ পদটি ফাঁকা তা এসব কর্মকান্ড দেখলেই বুঝা যায়। যেহেতু নেই তাহলে এরকম ভুল হবে এটাই স্বাভাবিক। পৌরবাসী কি পারলনা আর একটু বেশী টাকা খরচ করে কালভার্টের বদলে ব্রীজ নির্মাণ করতে? পারত, কিন্তু পরিকল্পনা অভাব এবং আমরা সাময়িক সমস্যার সমাধান করার জন্য ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি করছি। খালটি যদি প্রবাহমান থাকে আর নৌকা চলার উপযোগী হয় তাহলে ভারী মালামাল নদী পথে বহন করতে পারব। এটা যেমন স্বল্প খরচের আবার পরিবেশ বান্ধব কারণ খালটিতে নৌকা চলাচল করলে এর পানি পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করবে। পক্ষান্তরে রাস্তার উপরও চাপ কমবে তাতে রাস্তার দীর্ঘস্থায়ীত্ব বাড়বে।

আমাদের কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, মঠবাড়িয়ায় ভূগর্ভস্থ পানি নেই, সেক্ষেত্রে নদীর পানিই আমাদেরে একমাত্র ভরসা। যতই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা করা হউক তার মূল উৎস কিন্তু হবে নদীর পানি, আর নদীর পানি পেতে হলে খালকে কিন্তু আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। না হলে পানির জন্য হয়ত আমাদেরই দেখতে হবে নির্বাচনের আগে আমাদের জনপ্রতিনিধিরা বলছে, আমাকে ভোট দিলে আমি আপনাদের ঘরে ঘরে পানি পৌছে দিব। কিন্তু এ পানির জন্য মাসিক চার্জ দিতে হবে এবং তা যে বছর বছর বাড়বে, সে হিসেব কিন্তু আমাদের কাছে নেই। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটা জনপ্রতিনিধির দ্বারা সম্ভবও নয়, প্রতেকের কাছে ঘরে ঘরে বিনে পয়সায় পানি পৌছে দেওয়া। প্রতিনিয়ত পৌরসভায় যে পরিমাণ মানুষ বসত বাড়ি বানানো শুরু করছে তাতে নিকট ভবিষ্যতে মঠবাড়িয়া হবে দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর। হয়ত একদিন দেখব, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মত মঠবাড়িয়ায় খাল উদ্ধার কর্মসূচি হচ্ছে। সেদিন খুব দূরে নয়, মঠবাড়িয়ার রাজনীতি আবর্তিত হবে পানি সরবরাহ, আর জলাবদ্ধতা নিয়ে। আমরা অবশ্যই রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন করব কিন্তু আমাদের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনাকে কেন ধ্বংস করতে হবে? আমরা এত টাকা বরাদ্ধ দিচ্ছি রাস্তা উন্নয়নের জন্য কিন্তু খাল উন্নয়নের জন্য বরাদ্ধ ছিটে ফোটা। তবে ফকটাবাজদের জন্য হয়ত এটা সুখবর হবে, কারণ বাজারে পাগলা মলম কিংবা লাকি মলম এর চাহিদা অনেক গুণ বেড়ে যাবে। খাল, পুকুর ভরাট করে আমরা কিন্তু আমাদের শুধু পরিবেশই নষ্ট করছি, বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ না, পুকুর, খাল থাকলে বাচ্চারা সাঁতার কাটতে পারে এতে তাঁর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ভাল হয়। আমরা যদি খাল, জলাশয় ধ্বংস করি তাহলে আমরা পানি হারাবো, আর পানি হারালে টাটকা সবজ্বী, টাটকা মাছ হারাবো। এর পরিবর্তে স্থান নিবে ফরমালিন যুক্ত মাছ ও সবজ্বি। এটি একটি চক্রাকার পদ্ধতি। আমি পরিবেশের ক্ষতি করলে পরিবেশও আমাকে পাল্টা আঘাত করবে। আমাদের পরিবেশকে ঠিক রাখা সরকার বা জনপ্রতিনিধির একার কাজ না। সকলের সচেতন হওয়া উচিত। মঠবাড়িয়ায় যেহেতু ভূর্গস্থ পানি নাই সেহেতু এটা প্রায় নিশ্চিত নিকট ভবিষ্যতে আমরা পানির সংকট নিয়ে এক ভয়াবহ বিপযর্য়ের মধ্যে পড়ে যাব। তাই আমাদের সকলের উচিত যার যার অবস্থান থেকে পদক্ষেপ নেওয়া, যতটুকু পারি যেন আমি আমার পুকুর, খাল, জলাশয় ও খেলার মাঠ ধ্বংস না করি বা এহেন কোন কর্মকান্ড না করি যাতে এগুলো নষ্ট হয়।

পরিশেষে, আমাদের সকলের যেন এই প্রত্যাশা হয়, কোনভাবেই যেন আমি  আমার পরিবেশের প্রতিপক্ষ না হই। আগামীর মঠবাড়িয়ার প্রজন্মের কাছে এই হউক আমাদের সকলের অঙ্গীকার।

লেখক >> মো. মোস্তফা ডালিম,অফিসার,অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড।

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন