ঘুষ ও দুর্নীতি একটা জঘন্য অপরাধ। এ অপরাধের হোতা হচ্ছেন সমাজের ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাশীল ব্যক্তিরা। ঘুষ ও দুর্নীতি মানুষের বিবেক ও নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে। মেধা ও শ্রমের বিকাশ হ্রাস করে।প্রসাশন ও বিচার ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়।ইদানিং গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, মাঠে-ময়দানে বিশেষ করে রাজনৈতিক মঞ্চে দুর্নীতি শব্দটা বেশি ব্যবহার হচ্ছে।সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার সহজ উপায় হচ্ছে দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে হবে।তবে বর্তমানে দেশের অবস্থা দেখে মনে হয় ঘুষ ও দুর্নীতি উচ্ছেদ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারণ দুর্নীতি তথা ঘুষ লেন-দেন আমাদের দেশে এখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশের অফিস,আদালত,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক যন্ত্রে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। এমনকি বিচারকের আসনের নিচেও ঘুষ ঠাই নিয়েছে। শিক্ষা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়,শ্রেনীকক্ষে ভালভাবে পাঠদান না করে প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং সেন্টারে পাঠদান, নিয়মিত এবং যথাসময়ে শ্রেনীকক্ষে না আসা,দলীয় ভিত্তিতে ও টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার মানের চরম অবনতি ঘটিয়েছে।ফলে যোগ্যতা সম্পন্ন এবং দক্ষ মানব সম্পদের অভাব দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতা ও কর্মীরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে।তারা বেমালুম ভুলে গেছে যে,তাদের কার্যকলাপে দলের সুনাম নষ্ট হচ্ছে এবং জনগণ বিরুপ হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঘুষ ও দুর্নীতি কি? ঘুষ হচ্ছে টাকা-পয়সা বা কোন বস্তু প্রদান যাতে গ্রহনকারীর কোন অধিকার নেই। এ জাতীয় লেন-দেন করাকে ঘুষ বলা হয়। ইসলাম ধর্মে ঘুষ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ প্রসংগে বিশ্বনবী (সঃ) বলেছেন, ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ (মুসলিম শরীফ)। আভিধানিকভাবে দুর্নীতি শব্দের অর্থ হচ্ছে, নীতি বিরুদ্ধ আচরণ, অসদাচরণ,কুনীতি,নীতিহীনতা ইত্যাদি। যারা দুর্নীতি করে তারা দুর্নীতিবাজ বা দুর্বৃত্ত নামে পরিচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর তফসিলে বলা হয়েছে নিম্মোক্ত অপরাধগুলোই দুর্নীতিঃ (১) ঘুষ গ্রহন ও ঘুষ প্রদান (২) সরকারি কর্মচারীকে অপরাধমূলক কাজে সহায়তা করা। (৩) সরকারি কর্মচারী কর্তৃক কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে মূল্যবান বস্তু বিনামূল্যে গ্রহণ। (৪) কোন সরকারি কর্মচারী কর্তৃক পক্ষপাত মূলক আচারণ প্রদর্শন করা। (৫) কোন সরকারি কর্মচারী বেআইনীভাবে ব্যবসায়ে জরিত হওয়া। (৬) কোন ব্যক্তিকে শাস্তি বা কোন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত থেকে বাঁচানোর জন্যে সরকারি কর্মচারী কর্তৃক আইন লংঘন করা। (৭) অসৎ উদ্দেশ্যে ভুল নথিপত্র প্রস্তুত করা। (৮) অসৎ উদ্দেশ্যে অপরের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা। (৯) অপরাধ মূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করণ। (১০) নথি জাল করা। (১১) সঠিক দলিল বিনষ্ট বা গোপন বা জাল হিসেবে ব্যবহার করণ। (১২) হিসাব পত্র বিকৃত করা। (১৩) অসৎ কাজে নিযুক্ত হওয়া। (১৪) দুর্নীতিতে সহায়তা,ষড়যন্ত্র ও প্রচেষ্টা করণ।

উপরিউক্ত অপরাধগুলো মুলত অর্থ বা সম্পদের সাথে সম্পর্কযুক্ত।তাই দুর্নীতি বলতে অর্থনৈতিক অপরাধকে বুঝানো হয়েছে। পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা নিসার ২৯-৩০ নং আয়াতে বর্নিত আছে,”হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করিওনা। আর যদি কেহ সীমালংঘন করে অন্যায় করে তাহলে তাকে অগ্নিদগ্ধ করা হবে।এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ”।

দুর্নীতি শুধু বাংলাদেশে নয়,পৃথিবীর বহু দেশ দুর্নীতিতে ভেসে গিয়েছে। তবে বাংলাদেশে দুর্নীতির বিস্তার রয়েছে সর্বস্তরে। এ কারনেই বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শীর্ষে। বর্তমানে বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকার ঘুষ লেন-দেন হচ্ছে, যা বার্ষিক প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সমান।এছাড়া, দুর্নীতির রয়েছে বিশাল ও বিস্তৃত ক্ষেত্র। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতে, অবৈধ আয়ের পরিমান জাতীয় আয়ের ৩০-৩৫%।

ইসলামের দৃষ্টিতে দূর্ণীতির মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ ভোগ করা হারাম। হারাম বস্তু ভোগ করার শাস্তি জাহান্নাম। আমাদের দেশের দুর্নীতির চিত্র পাওয়া যায় ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ইধহমষধফবংয কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে। দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের যে আর্থিক ক্ষতি হয় তার পরিমান উন্নয়ন বাজেটের চেয়ে বেশি।সমাজ তথা দেশ থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে হলে প্রথমে অনুসন্ধান করতে হবে এর কারণ। অর্থাৎ কি কারণে বা কিভাবে সমাজে দুর্নীতি প্রকাশ করেছে তার অনুসন্ধান করতে হবে। তবে এটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। কারণ সব সমাজে দুর্নীতির কারণ এক নয়। অর্থের অভাব যদি দুর্নীতির কারণ হয় তাহলে বিত্ত্ববানদের দুর্নীতি করার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়,যার যত বেশি আছে তার লোভ যেন তত বেশি।

এ কারণেই কবি বলেছেন, ” এ জগতে হায়, সেই বেশি চায়,যার আছে ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি”। সুতরাং অর্থের অভাব দুর্নীতির একটা কারণ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। দুর্নীতির কারণগুলো হচ্ছেঃ(১) ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা নৈতিক শিক্ষার অভাব। (২) কর্মসংস্থানের অভাব।(৩) স্বল্প পারিশ্রমিক। (৪) রাজনীতিতে দেশপ্রেমিক, যোগ্য, দক্ষ ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের অভাব। (৫) অর্থনৈতিক বৈষম্য। (৬) ভোগ-বিলাসের প্রবনতা। (৭) নগদ পাওয়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ। (৮) সম্পদের মাপ কাঠিতে সামাজিক মর্যাদা নিরুপন। (৯) প্রশাসনিক যন্ত্র এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে স্বচ্ছ জনবলের অভাব। (১০) সামাজিক চেতনার অভাব। (১১) ত্রুটিপূর্ন বিচার ব্যবস্থা। (১২) রাজনৈতিক অস্থিরতা। (১৩) অফিস আদালতে ফাইল বন্দী করণ। (১৪) প্রতিরোধ করা যার দায়িত্ব তারই দায়িত্বহীনতা। (১৫) মুদ্রাস্ফীতি। (১৬) পারিপার্শ্বিক অবস্থা। (১৭)অবৈধ সম্পদ উপার্জনে প্রতিযোগিতার মনোভাব।দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্যে দুর্নীতিকে উচ্ছেদ করতে হবে। তা না হলে আগামী ১ দশকের মধ্যে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

মাদকের ন্যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্যে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীকে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি।

———————————————

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন