খালিদ সাব্বির▶️

যে মেয়ে আর কখনই বেড়াতে যেতে চাইবে না, খেলনা হাড়িপাতিল কিনে দেয়ার জন্য বায়না ধরবে না, গল্প শোনার জন্য জোরাজুরি করবে না, নিজের মত সাজতে চাইবে না, আর কারও ঘুম না ভাঙানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে মেয়ে নিজেই ঘুমের দেশে চলে গিয়েছে তাকে কতদিন মনে রাখা যায় ? মহাকালই বা কতদিন তাকে ধরে রাখত ? কিন্তু তার মৃত্যু যখন আমাদের অপরাধী করে দেয় তখন অবশ্যই মুখ লুকিয়ে ভালো থাকার ভান করা যায় না। স্বাভাবিক মৃত্যু উপহার দিতে না পারার দায় আমরা এড়াতে পারব না কোনদিন। তাকে আমাদের মনে রাখতে হবে, মনে রাখাতে হবে।

ওর নাম ছিল ঊর্মি। ছিল না, এখনো আছে। ও ঊর্মি হয়েই থাকবে আমাদের মাঝে। চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া আর দশটি কন্যা শিশুর মত আজও তার সময় কাটতে পারত যদিনা তার পুতুল খেলার দিনগুলো স্তব্ধ হয়ে না যেত। ঊর্মির বাবা সাংবাদিক সোহেল আমিনের লিখিত বক্তব্য থেকে জানতে পারি গত অক্টোবর মাসের একুশ তারিখ ঊর্মি নিখোঁজ হয় এবং এর দুদিন পরে সন্ধ্যায় তার লাশ পাওয়া যায়।

একটি কন্যা শিশুর লাশ পাওয়া গেছে বাড়ির পাশে বাগানে পরিত্যাক্ত একটি নালার মধ্যে। লাশ পাওয়ার পর তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে এ নিয়ে একজন সুস্থ মানুষ যত রকমের বিবৃতিই দিক না কেন আমি নিশ্চিত তা আসল ঘটনাকে স্পর্শ করতে পারবে না। কারণ একজন সুস্থ মানুষ এতটা বিকৃত চিন্তা করতে পারবে না যতটা বিকৃতভাবে ঊর্মিকে হত্যা করা হয়েছে।

হ্যাঁ ঊর্মি মারা যায়নি, ওকে হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যা প্রক্রিয়াটা বলতেই গলা শুকিয়ে আসে, চোখ ঝাঁপসা হয়ে যায়। কারণ চতুর্থ শ্রেনী পড়ুয়া একটি মেয়েকে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। ঘৃনা হয় নিজের প্রতি। ওকে যে ধর্ষণ করেছে সে পিশাচও যে একটা পুরুষ! ঊর্মির বাবার মুখ থেকে জানতে পারি পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দেখে তারা ধারণা করেছেন যে হত্যার পূর্বে ঊর্মিকে দেয়াল কিংবা মেঝেতে আছাড় মারা হয়েছে বারবার। অর্থাৎ ছোট্ট একটি শিশুকে প্রথমে ধর্ষণ, পরে দেয়াল ও মেঝেতে আছড়ে হত্যা এবং হত্যার পরে লাশ বাগানে ছুড়ে ফেলে দেয়া যেন তা কুকুর শিয়ালে নিয়ে নেয়। কী বীভৎস! কী বিকৃত!

এ দেশ মুক্তিযোদ্ধার দেশ, এ দেশ কবি সাহিত্যিকের দেশ, এ দেশ ধর্ষকেরও দেশ। এ দেশ সবুজের লীলাভূমি, এ দেশ ধর্ষকেরও চারণভূমি। এ দেশে চলন্ত বাসে ধর্ষণ হয়। স্কুল, কলেজ, অফিস, মসজিদ, মন্দির তো বটেই নিজ ঘরেও নারী ও কন্যা শিশু নিরাপদ নয়।

ঊর্মি হত্যাকান্ডটি ঘটেছে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার বড় মাছুয়া গ্রামে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে এলাকার মানুষ সোচ্চার হয়েছে। রাস্তায় নেমে এসেছে বিচারের দাবিতে। এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় ও ঢাকার সাংবাদিকবৃন্দ।সর্বত্র নৈতিক অধঃপতনের লাগামহীন প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে ওঠা এক ঘুণে ধরা সমাজে থেকে আমরা “বিচার চাই” বলে চিৎকার করা ছাড়া আর কী করতে পারি!

দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমাদের অগাধ আস্থা। আইনের আওতায় এনে চিহ্নিত অপরাধীদের শাস্তি দিন। কলঙ্কমুক্ত দেশ গড়ার সুযোগ নিন। দিনে দিনে শোকার্ত মায়ের অভিশাপে এ দেশের বাতাস যে বড্ড ভারী হয়ে উঠছে!

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন