মঠবাড়িয়া )প্রতিনিধি >>

স্ত্রী ও দুই সন্তানের ভরণপোষণ না দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে ফেলে রেখে সৌদি প্রবাসি আবুল কালাম গা ঢাকা দিয়েছে। এমনকি টানা ১৫ বছর ধরে প্রতারক প্রবাসি আবুল কালাম স্ত্রী মরিয়ম আক্তার(২৯) ও দুই সন্তান ছেলে অলিউল্লাহ(১৩) ও হাফসার(১১) কোন খোজঁ খবরও নিচ্ছেন না। উপরন্তু স্ত্রী ও দুই সন্তানের যাবতীয় ভরণ পোষণ করবেন এমন মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে দফায় দফায় মোটা অংকের হাতিয়ে নিয়েছেন। স্বামীর এমন প্রতারণার কবলে পড়ে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বড়শৌলা গ্রামের কৃষক শাহ আলম আকনের মেয়ে গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার দুই সন্তান নিয়ে অতি কষ্টে বাবার বাড়িতে জীবন যাপন করে আসছেন।
প্রবাসি স্বামীর এমন প্রতারণার বিচার দাবি করে ভূক্তক্তভোগি গৃহবধূ প্রতারক স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়া মেয়ে ও দুই নাতিকে ফেলে রাখা ও মিথ্যা আশ্বাসে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গৃহবধূ মরিয়মের বাবা মো. শাহ আলম প্রতারক প্রবাসি জামাইয়ের বিরুদ্ধে আদালতে পৃথক একটি মামলা দায়েরে করেছেন।

মামলা ভূক্তভোগি পরিবার সূত্রে জানাগেছে, মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী ইউনিয়নের কৃষক মো. শাহ আলম আকনের মেয়ে মরিয়ম আক্তারের সাথে ২০০২ সালে পাশ্ববর্তী বরগুনার বামনা উপজেলার লক্ষীপুরা গ্রামের মৃত ছাইদুর রহমানের ছেলে সৌদি প্রবাসি মো. আবুল কালাম ওরফে হাফেজ কালামের সাথে পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে হয়। বিয়ের পর এ দম্পতির সংসারে দুই সন্তান ছেলে অলিউল্লাহ ও মেয়ে হাফসার জন্ম হয়। কালাম বিয়ের পর থেকেই স্ত্রী সন্তানদের শ্বশুর বাড়িতে ফেলে রেখে এলাকায় কুরান শিক্ষা আর ওয়াজ নছিহত করে বেড়াতেন। এরপর কালাম ২০০৬ সালে স্ত্রী সন্তানদের শ্বশুর বাড়িতে ফেলে রেখে মরিয়মের বাবার নিকট হতে অর্থ হাতিয়ে সৌদি আরবে চলেন যান। এরপর আর সে তার স্ত্রী সন্তানের ভরণপোষণ তো দুরে থাক কোন খোঁজ খবরও নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনা।
এদিকে মরিয়ম নিরুপায় হয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয়ে থেকে অতি কষ্টে দুই সন্তানের লেখা পড়া চালিয়ে আসছে। শত দুরাবস্থার মধ্যেও ছেলে অলিউল্লাহ এখন নবম শ্রেণীর ছাত্র। সে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বড় শৌলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় হতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে। স্কুলে সে এক নম্বর রোলধারী মেধাবি শিক্ষার্থী। আর মেয়ে হাফসা একই বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে এক নম্বর রোলধারী ছাত্রী। হাফসা পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তিলাভ করেছে। দুই মেধাবী ভাইবোন বাবা আবুল কালামের মায়া মমতা থেকে জন্মাবধি বঞ্চিত । টানা ১৫ বছর ধরে ঈদ কিংবা কোরবানীতেও খোঁজ নেয়না প্রতারক বাবা। মাঝে মাঝে গোপনে দেশে আসলেও জানারও কোনও সুযোগ নেই স্ত্রী ও দুই সন্তানের।

এমন অবস্থার মধ্যে স্ত্রী ও সন্তানের সাথে প্রতারণার অভিযোগ এনে ২০১৫ সালে গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার তার স্বামী আবুল কালামের বিরুদ্ধে মঠবাড়িয়া উপজেলা বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। স্ত্রীর মামলায় আদালতের বিচারিক হাকিম এ.কে.এম কামাল উদ্দিন অভিযুক্ত আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারী করেন। কিন্তু ধূর্ত আসামী কালাম গ্রেফতার এড়িয়ে রয়েছেন। মাঝে মাঝে অতি গোপনে নাকি দেশে আসেন তবে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারছেনা। এমনকি প্রতারক কালাম আদালতেও হাজিরা দিচ্ছেন না।
অপরদিকে ওই মামলা দায়েরের পর প্রতারক কালাম স্ত্রী সন্তানদের মর্যাদা দিয়ে বাড়িতে তুলে নিবেন এমন আশ্বাস দিয়ে মরিয়মের বাবার নিকট অর্থ দাবি করে । এতে সে রাজি না হলে তার শ্যালক মো. সুমন আকনকে সৌদি আরবে কর্মসংস্থান করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। মেয়ে ও দুই নাতির ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে শ্বশুর শাহ আলম তার সৌদি প্রবাসি জামাতা কালামকে দুই দফায় সমুদয় অর্থ প্রদান করেন। এরপর প্রতারক কালাম শ্বশুর বাড়ির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
বাধ্য হয়ে শশ্বর শাহ আলম সৌদি প্রবাসি জামাতা আবুল কালামের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে ২০১৫ সালে আরও একটি মামলা দায়ের করেন।

স্বামী আবুল কালামের কাছে আর স্ত্রীর মর্যাদা চান না নির্যাতিত গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার । মরিয়ম বলেন, আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি। পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাড়াতে চাই। তবে এ প্রতারণার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। আমার দুই সন্তান ও আমার বাবার সমুদয় ক্ষতিপূরণের দাবি জানাই।

নিরাপরাধ দুই সন্তান অলিউল্লাহ ও হাফসা বলে, যে বাবা আমাদের অন্যায়ভাবে ফেলে রেখেছে তার বিচার চাই।

মরিয়মের বাবা শাহ আলম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, আমার মেয়ের এমন ক্ষতি রোজ চোখের সামনে দেখছি এর জন্য বাবা হিসেবে আমি এখন অপরাধি। আমার জামাতা কালাম একটা বড় প্রতারক । সে একটা চরিত্রহীন মানুষ । তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মাওলানা আবুল কালামের ছোট ভাই মো. আব্দুস সালাম জানান. তার ভাই সৌদি আরবে যাওয়ার আগে ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল পাসের পর এলাকায় কোরান শিক্ষা দিতেন। সে এলাকায় হাফেজ কালাম নামেও পরিচিত।
তিনি আরও বলেন, সে স্ত্রী ওসন্তানদের সাথে রেয প্রতারণা করেছে তাতে আমরা বিব্রত। সৌদি আরব যাওয়ার পরই ভাই আমার পাষাণ হয়ে গেছে। স্ত্রী ও সন্তানদের শ্বশুর বাড়িতে ফেলে রেখে কোন খোঁজ খবর সে নেয়না এতে ভাই হিসেবে আমরা ভিষন বিব্রত। সে আমাদের পরিবারের সাথে আদৌ কোনও যোগাযোগ রাখেনা। আমরা ভাই ও বোনেরাও রাখিনা। রক্তের ভাইয়ের চরিত্র এমন হলে কি করে রাখব। সে যে কাজ করছে তার উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত। তার শ্বশুর যখন সৌদি আরবে টাকা পাঠায় তখন আমি তাকে নিষেধ করেছিলাম । কিন্তু তার মেয়ে ও দুই সন্তানের কথা ভেবে টাকা পাঠিয়েছে। আমি নিজে সাক্ষি। এমন স্বার্থপর মানুষ কি করে আমার ভাই হয়। তার বিচার হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া থানার অফিসার ইন চার্জ (তদন্ত) মো. মাজহারুল আমীন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আসামী সৌদি প্রবাসি। সে মামলার আগে থেকেই সৌদি আরবে অবস্থান করছে। পুলিশ তাকে গ্রেফতারে চেষ্টা চালাচ্ছে।

SIMILAR ARTICLES

মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন